নভেম্বরে টানা আট মাস সংকুচিত হয়েছে চীনের উৎপাদন খাত। দেশটিতে ভোক্তা ও ব্যবসায়িক চাহিদা দুর্বল থাকায় নতুন রফতানি ও দেশীয় ক্রয়াদেশ কমেছে। পাশাপাশি গাড়ি, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন শিল্পে মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে উৎপাদনশীল খাতে চাপ বেড়েছে। পরিষেবা ও নির্মাণসহ শিল্পোৎপাদন বহির্ভূত খাতেও অবনমন দেখা গেছে। এসব সূচক দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির বড় অংশজুড়ে প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও এপি।
চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (এনবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশটিতে উৎপাদন খাতের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) মান এসেছে ৪৯ দশমিক ২। গত অক্টোবরে এ সূচকমান ছিল ৪৯। পিএমআই সূচক মান কোনো খাতে ৫০-এর বেশি হলে তা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বোঝায়। আর ৫০-এর কম হলে তা সংকোচন বোঝায়। এজন্য নভেম্বরের পিএমআই সংকোচন অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়। তাছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে পিএমআই ৫০-এর ওপরে না ওঠা বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকারই প্রতিফলন বলে জানান বিশ্লেষকরা।
এদিকে চীনে শিল্পোৎপাদন বহির্ভূত খাতের পিএমআই নেমে এসেছে ৪৯ দশমিক ৫-এ, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং প্রথমবারের মতো ৫০-এর নিচে নেমেছে। গত মাসে এ সূচকমান ছিল ৫০ দশমিক ১। পরিষেবা খাতে ভোক্তা ব্যয় কিছুটা বাড়লেও তা স্থায়ী হয়নি।
এনবিএসের পরিষেবা শিল্প জরিপ কেন্দ্রের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ হুও লিহুই বলেন, ‘মৌসুমি প্রভাব এবং অক্টোবরের সপ্তাহব্যাপী ছুটির পর কেনাকাটা ও সেবা গ্রহণ কমে যাওয়ায় শিল্পোৎপাদন বহির্ভূত খাতের পিএমআই কমেছে।’
চীনের উৎপাদন খাতে এ মন্থরতা দেখা দিচ্ছে এমন সময়ে, যখন দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে। গত মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ায় এক বৈঠকে সমঝোতায় পৌঁছেন। যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত কিছু শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয় এবং মার্কিন সয়াবিন কেনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয় চীন। তবে এ পদক্ষেপগুলো চীনের উৎপাদন খাতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। শুল্ক কমানোর ফলে রফতানিতে কিছু সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে এখনই তা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
এনবিএসের তথ্যানুযায়ী, রেল পরিবহন, টেলিকমিউনিকেশন, ব্রডকাস্টিং ও স্যাটেলাইট পরিষেবা খাতে নভেম্বরে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে সম্পত্তি সম্পর্কিত পরিষেবা ও গৃহস্থালি পরিষেবা খাতে পিএমআই এখনো ৫০-এর নিচে রয়েছে। হুও লিহুই বলেন, ‘এসব খাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম এখনো ধীরগতিতে এগোচ্ছে এবং চাহিদাও দুর্বল রয়েছে।’
চীনা নীতিনির্ধারকরা একই সঙ্গে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা ও ঘরোয়া বাজারে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সরকার এ প্রবণতাকে বলছে ‘ইনভোলিউশন’। বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্পত্তি খাতের দীর্ঘ মন্দা, বাড়ির দামের পতন ও ভোক্তা আস্থায় দুর্বলতা।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত অক্টোবরে খুচরা বিক্রি বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ, যা এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি।
বিশ্লেষকরা বলেন, এ খাতকে চাঙ্গা করতে সরকার যেসব ট্রেড-ইন ভর্তুকি নীতি চালু করেছিল, সেগুলোর প্রভাব কমে এসেছে। পুরনো ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার বা গাড়ি বদলে নতুন পণ্য কেনায় সরকার যে ভর্তুকি দিচ্ছিল তা ধীরে ধীরে তুলে নেয়া হচ্ছে। এতে ভোক্তা ব্যয় আবারো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনা অর্থনীতিবিদ জিচুন হুয়াং বলেন, ‘দেশী চাহিদার সংকেত এখনো মিশ্র। আর ভর্তুকির সুবিধা কমে যাওয়ায় উৎপাদিত পণ্যের বিক্রিও তেমন বাড়ছে না।’
চীনের অর্থনীতির আকার ১৯ ট্রিলিয়ন বা ১৯ লাখ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। এর মধ্যে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের নীতিসহায়তা প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে উৎপাদন পরিষেবা দুই খাতেই দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষক ইউটিং ইয়াং বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, সরকার বড় ধরনের নীতিসহায়তা আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকের আগে দেবে না। কারণ চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য মোটামুটি অর্জনযোগ্য।’
ম্যাককোয়ের হংকংভিত্তিক চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক এখনো চীনের অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলেনি। তাই নীতিনির্ধারকরা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি না হলে বড় প্রণোদনা থেকে বিরত থাকতে পারেন।’